হিমাপক্ষয়
পানি জমে বরফে পরিণত হওয়ার কারণে সংঘটিত যান্ত্রিক অবক্ষয় প্রক্রিয়া উইকিপিডিয়া থেকে, বিনামূল্যে একটি বিশ্বকোষ
হিমাপক্ষয় (ইংরেজি: frost weathering) হচ্ছে পানি জমে বরফে পরিণত হওয়ার সময় উদ্ভূত পীড়নজনিত কারণে সংঘটিত কতগুলো যান্ত্রিক অবক্ষয় প্রক্রিয়া বোঝাতে ব্যবহৃত একটি সমষ্টিগত পরিভাষা। হিম বিচূর্ণীকরণ (frost shattering), ফ্রস্ট ওয়েজিং (frost wedging), শৈত্যফাটল (cryofracturing) – এর মত প্রক্রিয়াগুলোকে বোঝানোর জন্য সার্বিক পরিভাষা হিসেবে এই শব্দটি ব্যবহৃত হয়ে থাকে। এই প্রক্রিয়াটি স্থানিক (spatial) এবং অস্থায়ী মাপকাঠির বিস্তীর্ণ পরিসীমার মধ্যে ক্রিয়াশীল হতে পারে; সেটা কয়েক মিনিট থেকে বছরের পর বছর ধরে চলতে পারে, আবার কোন খনিজের সূক্ষ্ম দানার স্থানচ্যুতি থেকে বৃহৎ শিলাখণ্ডে ফাটল ধরাও হতে পারে। ভূ-পৃষ্ঠ থেকে অধিকতর উচ্চতা এবং উচ্চ অক্ষাংশ অঞ্চলে, বিশেষ করে আল্পীয় (alpine), হিমবাহিক/ হিমবাহ-বেষ্টিত (periglacial), উপমেরুজ সামুদ্রিক (subpolar maritime) এবং মেরুজ (polar) জলবায়ুতে এই প্রক্রিয়াটি স্পষ্টভাবে পরিলক্ষিত হয়। তবে তাপমাত্রা হিমাংকের নিচে থাকে (-৩.০° থেকে -৮.০° সেলসিয়াস) এমন যে কোন স্থানে এটি দেখা যেতে পারে।[১]
হিম বিভাজন
কৈশিক ক্রিয়ার মাধ্যমে পানি স্থানান্তরের ফলস্বরূপ নির্দিষ্ট ধরনের কিছু হিম-সংবেদনশীল মৃত্তিকা প্রসারিত বা স্ফীত হয় এবং বরফমুখের কাছে হিম লেন্স (ice lenses) গঠন করে।[২] শিলার ছিদ্রায়িত স্থানগুলোতেও একই ঘটনা ঘটে। বরফ সঞ্চয় ক্রমশ বাড়তে থাকে কেননা তা আশপাশের ছিদ্র থেকে পানিকে আকৃষ্ট করে। বরফ কেলাসের বৃদ্ধি কোন শিলাকে দুর্বল করে দেয়, যা এক সময় ভেঙ্গে যায়।[৩] এর কারণ হচ্ছে, যখন পানি জমে বরফে পরিণত হয়, তখন তা প্রসারিত হয়। তখন বরফ ঐ আবদ্ধ অংশের প্রাচীরে যথেষ্ট পরিমাণে চাপ প্রয়োগ করতে থাকে। উন্মুক্ত শিলা (যেমন- বেলেপাথর) আছে এমন যে কোন আর্দ্র, নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চলে এটা বেশ সাধারণ একটা প্রক্রিয়া। অনেক সময়ই উন্মুক্ত বেলেপাথরের নমুনা পাওয়া যায় যার পৃষ্ঠের ভেতর বালুকণা থাকে; সেটা হয়ে থাকে শিলাকণাগুলো একে একে চূর্ণ হয়ে যাওয়ার কারণে। এই প্রক্রিয়াকে অনেক সময় হিম খণ্ডায়ন (frost spalling) বলা হয়ে থাকে। বাস্তবিকভাবে, অনেক অঞ্চলের উন্মুক্ত শিলার ক্ষেত্রে এটাই সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ অবক্ষয় প্রক্রিয়া।
পিচঢালা রাস্তাতেও একই ধরনের প্রক্রিয়া দেখা যেতে পারে, যা বিভিন্ন ধরনের ফাটল বা অন্যান্য সংকটের উদ্রেক করে। যানবাহন আর পানির অনুপ্রবেশের সাথে মিলে তা খানাখন্দ ও গর্ত[৪] সৃষ্টিসহ রাস্তাঘাটের অন্যান্য রুক্ষতাকে ত্বরান্বিত করে।[৫]
আয়তনিক সম্প্রসারণ
সারাংশ
প্রসঙ্গ
হিমাপক্ষয়ের কারণ হিসেবে প্রচলিত ব্যাখ্যা ছিল জমাট বাঁধা বরফের আয়তনিক সম্প্রসারণ। যখন পানি জমে বরফ হয়ে যায়, এর আয়তন শতকরা ৯ শতাংশ বৃদ্ধি পায়। সুনির্দিষ্ট কিছু পরিস্থিতিতে, এই প্রসারণ কোন শিলার স্থানচ্যুতি বা চিড় ধরার কারণ হতে পারে। -২২ °সে. তাপমাত্রায়, বরফের বৃদ্ধিজনিত কারণে ২০৯ মেগাপ্যাসকেল পর্যন্ত চাপ উৎপন্ন হতে পারে, যা যে কোন শিলায় চিড় ধরানোর জন্য যথেষ্ট।[৬][৭] আয়তনিক সম্প্রসারণের মাধ্যমে হিমাপক্ষয় সংঘটনের জন্য, ঐ শিলায় খুব নগণ্য পরিমাণে বায়ু থাকতে হবে যার সংকোচনের মাধ্যমে বরফ সম্প্রসারিত হওয়ার জায়গা পাবে। এর মানে হচ্ছে, তা পানি-সম্পৃক্ত এবং সব দিক থেকে দ্রুত জমাটবদ্ধ হতে হবে যেন পানি স্থানান্তরিত হওয়ার সুযোগ না পায়, এবং শিলার ওপর চাপ প্রযুক্ত হয়।[৬] এই শর্তগুলোকে অস্বাভাবিক বলেই বিবেচনা করা হয়[৬], কেননা তাতে পুরো প্রক্রিয়াটি শিলাপৃষ্ঠের মাত্র কয়েক সেন্টিমিটারের মধ্যে এবং হিম ফাটল (ice wedging) প্রক্রিয়ায় গঠিত বৃহত্তর পানিপূর্ণ ফাটলের উপস্থিতির মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে।
সকল আয়তনিক সম্প্রসারণই জমাটবদ্ধ পানি কর্তৃক প্রযুক্ত চাপের কারণে ঘটে না; এটা জমাট না বাঁধা পানিতে বিদ্যমান পীড়নের কারণেও হতে পারে। বরফ প্রবৃদ্ধির কারণে যখন ছিদ্রস্থিত পানিতে পীড়ন আবিষ্ট হয়, যার কারণে শিলার ভাঙন ঘটে; ঐ ঘটনাকে বলা হয় হাইড্রোফ্র্যাকচার। শিলায় পরস্পর সংযুক্ত বৃহৎ ছিদ্রসমূহ অথবা বৃহৎ জলীয় অবক্রম (hydraulic gradient) হাইড্রোফ্র্যাকচারিং এর জন্য সহায়ক। যদি সূক্ষ্ম ছিদ্র থাকে, শিলার অংশবিশেষে পানির অতি দ্রুত হিমায়নের কারণে পানি অপসারিত হতে পারে, এবং যদি পানি স্থানান্তরের তুলনায় অপসারণের হার দ্রুততর হয়, চাপ বৃদ্ধি পেয়ে ঐ শিলায় ফাটল ধরতে পারে।
যেহেতু আবহাওয়াজনিত বাহ্যিক ক্ষয় নিয়ে গবেষণা শুরু হয় ১৯০০ এর দিকে, ১৯৮০-র দশক পর্যন্ত আয়তনিক সম্প্রসারণকেই হিমাপক্ষয়ের মুখ্য কারণ বলে মনে করা হত।[৮] ১৯৮৫ ও ১৯৮৬ সালে ওয়াল্ডার এবং হ্যালেট এর প্রকাশিত কর্মে এই দৃষ্টিভঙ্গিকে চ্যালেঞ্জ করা হয়।[৬][৮] বর্তমানকালে, মাৎসুওকা ও মার্টনের মত গবেষকগণ "আয়তনিক সম্প্রসারণের মাধ্যমে হিমাপক্ষয়ের জন্য প্রয়োজনীয় শর্তাবলি"- কে অস্বাভাবিক বলে বিবেচনা করেন।[৬] তবে, সাম্প্রতিককালে প্রকাশিত অনেক গবেষণা সাহিত্য থেকে এটাই প্রতীয়মান হয় যে, গতানুগতিক ঘটনাবলির ক্ষেত্রে হিম বিভাজন একটি গ্রহণযোগ্য পরিমাণগত নকশা (quantitative model) প্রদানে সক্ষম; কিন্তু প্রচলিত সরল আয়তনিক সম্প্রসারণ তা পারে না।[৯][১০][১১][১২][১৩][১৪][১৫]
আরও দেখুন
- প্রবাহী স্থিতিবিদ্যা
- ছিদ্রস্থ জল চাপ
- মৃত্তিকা আবহবিকার
- Ice jacking
- Bratschen
- Solifluction
তথ্যসূত্র
Wikiwand - on
Seamless Wikipedia browsing. On steroids.