বেইথ নেসেট
ইহুদি ধর্মের উপাসনালয় উইকিপিডিয়া থেকে, বিনামূল্যে একটি বিশ্বকোষ
বেইথ নেসেট (হিব্রু ভাষায়: בית כנסת, 'সমবেত হওয়ার ঘর', বা בית תפילה বেইথ তেফিলা, "প্রার্থনার ঘর") হলো একটি ইহুদি বা কিছু ক্ষেত্রে শমরীয় উপাসনালয়। নেসেট ঘরগুলোতে একটি মূল উপাসনা কক্ষ ছাড়াও অধ্যয়ন কক্ষ, সামাজিক কক্ষ ও দপ্তর থাকে। কোন কোন নেসেটে তোরাহ অধ্যয়নের জন্য বেইথ মিদরাশ (בית מדרש, অনু. "অধ্যয়ন কক্ষ") নামক আলাদা কক্ষ থাকে।




নেসেট ঘর হলো ইহুদিদের জন্য একটি পবিত্র জায়গা যা প্রার্থনা, তানাখ অধ্যয়ন করার জন্য ব্যবহৃত হয়ে থাকে যদিও এই উপাসনালয়কে ইহুদিদের জন্য হতে হবে ব্যাপারটা তেমন নয়। হালাখা বলে যে ইহুদি সম্প্রদায় যদি অন্তত দশজন ইহুদি যোগাড় করতে পারে তাহলে তারা প্রার্থনার জন্য উপাসনালয়ে জড় হতে পারবে। ইহুদি উপাসনা একা কিংবা দশজন মিলে করা যায় যদিও হালাখা মতে কিছু বিশেষ প্রার্থনা শুধুমাত্র ঐক্যবদ্ধ হয়েই (মিনয়ান) করতে হবে। ইহুদি প্রার্থনালয় কোনভাবেই জেরুসালেমের পবিত্র মন্দিরের বিকল্প নয়।
পরিভাষা

ইসরায়েলীরা ইহুদি উপাসনালয় বুঝাতে হিব্রু ভাষায় বেইথ নেসেট (সমবেত হওয়ার ঘর) ব্যবহার করে। আশকেনজি ইহুদিরা ঐতিহ্যগতভাবে ইদ্দিশ শব্দ শুল ব্যবহার করে (যা এসেছে জার্মান শব্দ 'স্কুল' থেকে)। শেফার্দি ইহুদি ও রোমানিওট ইহুদিরা কাল (এসেছে হিব্রু শব্দ কাহাল থেকে যার অর্থ "সম্প্রদায়") শব্দ ব্যবহার করে। স্পেনিশ ইহুদিরা এসনোগা ও পর্তুগিজ ইহুদিরা সিনেগোগা নামে একে চিনে। পারসিক ইহুদি ও কিছু কারাইতে ইহুদি কেনেসা শব্দটি ব্যবহার করে থাকে যা আরামীয় ভাষা থেকে আগত এবং কিছু মিজরাহি ইহুদি কেনিস শব্দটি ব্যবহার করে। কিছু পুনর্গঠিত ও সংস্কারবাদী ইহুদি মন্দির শব্দ ব্যবহার করে থাকে। ইংরেজি ভাষায় ইহুদি উপাসনালয় বুঝাতে গ্রিক শব্দ সিনেগোগ ব্যবহৃত হয়।[১] উল্লেখ্য বাংলা ভাষায় এর কোন পরিভাষা নেই।
অভ্যন্তরীণ উপাদানসমূহ
সারাংশ
প্রসঙ্গ
বিমাহ (প্ল্যাটফর্ম)
সব প্রার্থনালয়ে বিমাহ নামক অধ্যয়নকারীদের জন্য একটি বড় প্লাটফর্ম থাকে যেখানে তোরাহ পান্ডুলিপি অধ্যয়নের জন্য রাখা হয়। শেফার্দি উপাসনালয়ে বিমাহতে প্রার্থনা দলের নেতার অধ্যয়ন করার ডেস্ক রাখা হয়ে থাকে।[২]
- ইতালির সালুজ্জোয় অবস্থিত সালুজ্জো উপাসনালয়ের বিমাহ
- যুক্তরাষ্ট্রের রোড আইল্যান্ডের নিউপোর্টের তৌরো উপাসনালয়ের বিমাহ
- পোল্যান্ডের ক্রাকুফের পুরনো উপাসনালয়ের ঢালাই লোহায় তৈরি বিমাহ
টেবিল
আশকেনজি উপাসনালয়ে পাঠ করার টেবিলে তোরাহ পড়তে হয় যা কক্ষের কেন্দ্রে রাখা হয়। প্রার্থনা দলের প্রধানের (হিব্রু ভাষায় হাজ্জান) তোরাহ পাঠের জন্য নিজস্ব টেবিল থাকে যা তোরাহ সিন্দুকের দিকে মুখ করা থাকে। শেফার্দি উপাসনালয়ে তোরাহ পাঠ করার টেবিল কক্ষের তোরাহ সিন্দুকের অবস্থানের বিপরীত দিকে রাখা হয় যাতে তলার মধ্যখানের খালি জায়গায় ধর্মানুষ্ঠান আয়োজন করা যায়।[৩] বেশিরভাগ সমকালীন উপাসনালয়গুলোতে রাব্বাইয়ের জন্য বক্তব্য প্রদানের ডেস্ক থাকে।[৪]
তোরাহ সিন্দুক
তোরাহ সিন্দুক, হিব্রু ভাষায় ארון קודש আরোন কোদেশ বা 'পবিত্র সিন্দুক', যার আরেক নাম হেইখাল—היכל বা 'মন্দির' (শেফার্দি ইহুদিদের ভাষায়), একটা সিন্দুক যেখানে তোরাহ পান্ডুলিপিগুলো রাখা হয়।
উপাসনালয়ের এই সিন্দুকটি এমনভাবে কক্ষে স্থাপন করা হয় যেন তা জেরুসালেমের দিকে মুখ করা থাকে। তবে পশ্চিমা বিশ্বে এটি সাধারণত পূর্ব দিকে মুখ করা থাকে, অন্যদিকে ইসরায়েলের পূর্ব দিকে অবস্থিত হলে পশ্চিম দিকে মুখ করা থাকে। ইসরায়েলে অবস্থিত উপাসনালয় জেরুসালেমের দিকে মুখ করা থাকে। মাঝেমধ্যে নির্মাণশৈলীর কারণে কিছু উপাসনালয় ভিন্ন দিকে মুখ করে থাকে, সেক্ষেত্রে শুধু প্রার্থনার সময় লোকজন জেরুসালেম মুখী হয়।
তোরাহ সিন্দুকটি হলো চুক্তিসিন্দুকটির স্মারক যার ভেতর দশ আজ্ঞার ফলক থাকতো। এটি ইহুদি উপাসনালয়ের সবচাইতে পবিত্র স্থান। তোরাহ সিন্দুকটি প্রায় অলঙ্কৃত পর্দা (হিব্রু ভাষায় পারোখেত) দ্বারা বন্ধ করা থাকে যা সিন্দুকটির বাইরে ঝুলানো থাকে।
চিরন্তন ঝাড়বাতি

অন্যান্য ঐতিহ্যের মধ্যে একটি হলো বাতি বা ঝাড়বাতির অবিরত প্রজ্বলন যাকে হিব্রু ভাষায় নের তামিদ বলা হয়। "চিরন্তন ঝাড়বাতি" ঐশ্বরিক উপস্থিতিকে সম্মান প্রদানের জন্য ব্যবহার করা হয়ে থাকে।[৫]
অভ্যন্তরীণ সজ্জা

ইহুদি উপাসনালয়ে বিভিন্ন চিত্র ও নকশা অঙ্কন করা যেতে পারে, কিন্তু রাব্বাইনীয় এবং সনাতনী ঐতিহ্যে জীবিত প্রানীর ভাষ্কর্য রাখা বা ছবি অঙ্কনের নিয়ম নেই কেননা তা ইহুদি ধর্মে সাকার উপাসনা হিসেবে ধরা হয়।[৬]
বসার আসন
মূলত প্রার্থনালয়ে অনেক আসবাবপত্র ব্যবহৃত হলেও স্পেন, মাগরেব (উত্তর আফ্রিকা), ব্যাবিলন, ইস্রায়েল দেশ ও ইয়েমেনে চেয়ার ও বেঞ্চের পরিবর্তে মাদুর এবং বালিশের সাথে মেঝেতে বসার ঐতিহ্য বিদ্যমান ছিলো।[৭] বর্তমান যুগে নেসেট ঘরে চেয়ার বা বেঞ্চে বসার ঐতিহ্য জনপ্রিয়।[তথ্যসূত্র প্রয়োজন]
উনবিংশ শতাব্দীর আগে আশকেনজি উপাসনালয়ে সব আসন তোরাহ সিন্দুকের দিকে মুখ করা থাকতো। শেফার্দি উপাসনালয়ে মূল কক্ষের পরিধির আশেপাশে আসন বসানো হতো কিন্তু যখন প্রার্থনার জন্য সবাই উঠে দাঁড়াতো তখন সবাই তোরাহ সিন্দুকের দিকে মুখোমুখি হতো।[তথ্যসূত্র প্রয়োজন]
বিশেষ আসন
বর্তমানে অনেক নেসেট ঘরে ব্রিট মিলাহ উৎসবে নবী এলিয়াহুর নামে একটি বড় চেয়ার রাখা হয়।[৮]
প্রাচীন উপাসনালয়গুলোতে তোরাহ সিন্দুকের পাশে জেরুসালেমের দিকে মুখ করে একটি বিশেষ চেয়ার রাখা হতো যে চেয়ারে বিশেষ অতিথি ও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি বসতো।[৯] পাথরে খোদাই করা ফলকযুক্ত এরকম একটি আসন প্রত্নতাত্ত্বিক খননকাজের সময় গালীলের খরাজিনে পাওয়া গেছে যার তারিখ চতুর্থ-ষষ্ঠ শতাব্দী নির্ধারণ করা হয়েছে।[১০] এরকম আরেকটি আসন ডেলোস উপাসনালয়ে আবিষ্কৃত হয়েছে।
অংশগ্রহণকারীদের জন্য নিয়ম
খালি পায়ে প্রবেশ
ইয়েমেনে ইহুদিরা ঐতিহ্য অনুসারে উপাসনালয়ে প্রবেশের পূর্বে জুতো খুলে নেয় যা বিভিন্ন জায়গার ইহুদিদের মাঝে পুরনো সময় থেকে প্রচলিত ছিলো।[১১] জুতো খুলে প্রবেশের একই নিয়ম মরক্কোর ইহুদিরা বিংশ শতাব্দী পর্যন্ত পালন করতো। তিউনিসিয়ার জিরবা দ্বীপের ইহুদি সম্প্রদায় এখনো তাদের প্রার্থনালয়ে প্রবেশের পূর্বে জুতো খোলার নিয়ম পালন করে। বর্তমানে জুতো খুলে প্রবেশের নিয়ম ইসরায়েলে পালন করা হয় না।[তথ্যসূত্র প্রয়োজন]
লিঙ্গ আলাদাকরণ
সনাতনী উপাসনালয়গুলোতে পুরুষ ও মহিলাদের একত্রে বসার নিয়ম নেই। প্রার্থনা কক্ষের মাঝে বিভাজক পর্দা (মেখিটজা) দিয়ে পুরুষ ও মহিলাদের আলাদা করা হয় কিংবা মহিলাদের জন্য উপাসনালয়ের বারান্দায় বসার ব্যবস্থা করে দিয়ে পুরুষদের থেকে পৃথক করে দেওয়া হয়।[১২]
কমিউনিটি সেন্টার হিসেবে
উপাসনালয়গুলো প্রায়শই ইহুদি সম্প্রদায়দের বিভিন্ন উদ্দেশ্যে সেবা প্রদানের জন্য ব্যবহৃত হতো যেমন ক্যাটারিং হাউজ, কশার রান্নাঘর, ধর্মীয় বিদ্যালয়, পাঠাগার, দিবা যত্ন কেন্দ্র এবং নিয়মিত সেবা প্রদানের জন্য একটি ক্ষুদ্রতর প্রার্থনাগৃহ।
উপাসনালয়ের প্রশাখা
যেহেতু অনেক সনাতনী ও সংস্কারবাদী ইহুদি একা প্রার্থনার চেয়ে মিনয়ানে প্রার্থনা করতে পছন্দ করে তাই তারা দপ্তর, নিজ কক্ষ ও অন্যান্য স্থানে ঐক্যবদ্ধভাবে প্রার্থনা করার জন্য পূর্বপরিকল্পনা করে রাখে যেহেতু সেই স্থানগুলো প্রাতিষ্ঠানিক উপাসনালয়গুলোর চেয়ে বেশি সুবিধাজনক। প্রার্থনার জন্য ব্যবহৃত কক্ষ বা ভবনকে প্রার্থনা কাজের জন্য উৎসর্গ করা যেতে পারে। আশকেনজি ইহুদিরা এই নিয়মকে বলে শিয়েবেল (ইদ্দিস ভাষায় "ছোট ঘর")। শিয়েবেল পৃথিবীর সব সনাতনী সম্প্রদায়ে পাওয়া যায়।
আরেক ধরনের প্রার্থনাকারী সম্প্রদায় গ্রুপ রয়েছে যাদেরকে খাভুরাহ (প্রার্থনা সাহচার্য) বলা হয়। এই গ্রুপগুলো নির্দিষ্ট স্থান ও সময়ে নিয়মিত একত্রিত হয় যা কোন ব্যক্তিগত বাড়ি বা উপাসনালয় কিংবা প্রাতিষ্ঠানিক স্থানে হতে পারে। ধ্রুপদী সভ্যতায়, ফরিশীগণ খাভুরাহদের কাছে থাকতেন এবং একসাথে পানাহার করতেন এটা নিশ্চিত করতে যে কোন খাবার যেন নষ্ট না হয়।[১৩]
তথ্যসূত্র
বহিঃসংযোগ
Wikiwand - on
Seamless Wikipedia browsing. On steroids.